এই বর্ষায় টাঙ্গুয়ার হাওড় যাবার উপযুক্ত সময়। সেই সাথে জোছনা রাত যদি হয় তাহলে তো কথাই নেই। সময় সুযোগ আসলে টাঙ্গুয়ার ঘুরে আসার সুযোগ মিস না করার অনুরোধ। এ এক অন্য বিশালতার সৌন্দর্য যা শুধু নিজের চোখে তৃপ্তি নিয়ে উপভোগ করতে হয়। টলটলে পরিষ্কার হাওড়ের পানি আর ওপাশে দু চোখ জুড়ে থাকা ইন্ডিয়ার উঁচু নিচু পাহাড় মনোমুগ্ধকর।
কিভাবে যাবেনঃ দুইভাবে তথা বাসে বা ট্রেনে করে টাঙ্গুয়ার হাওড় যাওয়া যায়।
১। ঢাকা থেকে ট্রেনে মোহনগঞ্জ হয়ে টাঙ্গুয়ার হাওড়
২। ঢাকা থেকে বাসে তাহিরপুর হয়ে টাঙ্গুয়ার হাওড়
২। ঢাকা থেকে বাসে তাহিরপুর হয়ে টাঙ্গুয়ার হাওড়
ঢাকা থেকে মোহনগঞ্জ - ঢাকা থেকে মোহনগঞ্জ যেতে হলে হাওড় এক্সপ্রেস ট্রেনে করে যেতে পারবেন। এই ট্রেন ঢাকা থেকে ছেড়ে ময়মনসিং নেত্রকোনা হয়ে মোহনগঞ্জ শেষ স্টপেজ। রাত ১১ঃ৫০ এ ঢাকার কমলাপুর থেকে মোহনগঞ্জের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। সকাল ৬টায় মোহনগঞ্জ ষ্টেশনে এসে পৌঁছায়। ট্রেনের ভাড়া শোভন চেয়ার ২২০ টাকা। মোহনগঞ্জ থেকে সিএনজি করে চলে আসুন মধ্যনগর , ভাড়া জনপ্রতি ১০০। এবার ট্রলার ভাড়া করে ঘুরে আসুন টাঙ্গুয়ার হাওড়। তবে একদম সিজনে গেলে ট্রলার আগে থেকে ঠিক করে রাখা উত্তম।
ঢাকা > মোহনগঞ্জ > মধ্যনগর > টাঙ্গুয়ার হাওড় (টেকেরঘাট)
ঢাকা থেকে সুনামগঞ্জ - ঢাকা থেকে সরাসরি সুনামগঞ্জ যেতে হলে বাসে যেতে হবে। ঢাকার মহাখালী থেকে ননএসি এনা পরিবহনের বাস সুনামগঞ্জে যায়। বাসা ভাড়া ৫৫০টাকা। এছাড়া সায়েদাবাদ থেকে শ্যামলী পরিবহনের বাসে করে সুনামগঞ্জ জেলায় যেতে পারেন। এরপর লেগুনা/সিএনজি অথবা বাইক করে তাহিরপুর যেতে হবে। সেখান থেকে ট্রলার ভাড়া করে ঘুরে আসুন টাঙ্গুয়ার হাওড়।
ঢাকা > সুনামগঞ্জ > তাহিরপুর > টাঙ্গুয়ার হাওড় (টেকেরঘাট)
[অর্থাৎ আপনি মোহনগঞ্জ কিংবা তাহেরপুর যেখান থেকেই ট্রলারে উঠেন না কেনো আপনাকে ট্রলারে করে টেকেরঘাট আসতে হবে]
থাকা এবং খাওয়াদাওয়াঃ থাকতে হলে আপনাকে ট্রলারেই থাকতে হবে। মধ্যনগর কিংবা তাহিরপুর যেখান থেকেই উঠেন না কেনো আপনাকে টেকেরঘাট আসতে হবে। যদিও শুনেছি টেকেরঘাটের দিকে হোটেল আছে কিন্তু সেসব সম্পর্কে খুব একটা জানা নেই। তবে আমি সাজেস্ট করবো ট্রলারেই থাকতে। আশেপাশে আরও বহু এমন টুরিস্ট পাবেন যারা খোলা আকাশে ট্রলারে থাকছে। আর নিরাপত্তা নিয়ে কোন দুশ্চিন্তা নেই, একদম সেইফ মনে হয়েছে আমার কাছে।
খাওয়াদাওয়া নিয়ে চিন্তার কিছু নেই, ট্রলারের মাঝি মামাই রান্না করে দেয়। তাই ট্রলার ঠিক করার সময় রান্নাবান্নার ব্যাপারটা ফুরিয়ে নিবেন। আর ট্রলারে উঠার আগে বাজার করে নিবেন প্রয়োজন অনুযায়ি যতজন মানুষ এবং যত বেলা খাবেন।
এছাড়া যা যা দেখবেনঃ
১। ওয়াচ টাওয়ার
২। টেকেরঘাট
৩। নিলাদ্রি লেক
৪। লাকমাছড়া
৫। রাজাইছড়া ঝিরি
৬। বারিক্কা টিলা
৭। জাদুকাটা নদী
৮। শিমুল বাগান
প্রথমদিন ট্রলারে করে টেকেরঘাট নিয়ে যাবে আপনাকে। তাই নাস্তা সেরে এবং বাজার করে ট্রলারে উঠে পড়ুন। যাবার পথে ওয়াচ টাওয়ার চলে যান। সেখানের পানিতে নেমে গোসল সেরে নিতে পারেন। গোসল শেষে তারপর ট্রলারেই দুপুরের খাবার সেড়ে নিন। খাওয়াদাওয়া শেষ করে এবার রওনা হোন টেকেরঘাটের উদ্দেশ্যে। টেকেরঘাট পৌঁছাবার পর সেখানে বিকেলবেলাটা নিলাদ্রি লেকের কাছে চলে যান। তারপর সন্ধ্যায় বাজারের দিকে যেয়ে চা নাস্তা করে নিতে পারেন। সে রাত ট্রলারে খাওয়াদাওয়া সেরে ট্রলারেই ঘুমুতে হবে কিংবা ট্রলারে ছাদে বসে রাতের হাওড় উপভোগ করুন। পরদিন সকালে নাস্তা সেরে বাইক ভাড়া করতে হবে আপনাকে বাকি জায়গাগুলো ঘুরে আসতে। বাইকে দুজন করে বসতে পারবেন। তার আগে দরদাম করে ঠিক করে নিন বাইকওয়ালার সাথে কি কি ঘুরে আসবেন। বাইক ভাড়া ৩০০ এর মত রাখবে। বাইকে উঠে প্রথমে চলে আসুন লাকমাছড়া, এটা অনেকটা সিলেটের বিছানাকান্দির মত। এরপর আবার বাইকে উঠে পড়ুন এবার চলে যান রাজাইছড়া ঝিরিতে। সেখান থেকে এরপর বাইকে করে চলে আসুন বারিক্কা টিলা। এখান থেকে জাদুকাটা নদী দেখতে পারবেন পাশ ঘেঁষে বয়ে গেছে। এবার আবার বাইকে চরে চলে আসুন শিমুল বাগানের দিকে। বাইক থেকে নেমে ছোট নৌকা জনপ্রতি ২০টাকা করে ছোট নদী পার হলেই শিমুল বাগান। বাগানের টিকেট ৩০টাকা জনপ্রতি। ঘুরাঘুরি শেষ হলে আবার বাইকে করে চলে আসুন ফিরতি পথে যেখান থেকে বাইক ভাড়া করেছেন। এরপর গোসল করতে চাইলে নিলাদ্রি লেকে চলে যান, গোসল শেষে ট্রলারে দুপুরের খাবার সেরে নিতে পারেন। এবার ট্রলারে করে ফিরতি পথে ব্যাক করার পালা....
এই জুলাই মাসে আমরা ২৩ জন ঘুরতে গিয়েছিলাম টাঙ্গুয়ার হাওড় মোহনগঞ্জ হয়ে। ট্রলার ভাড়া লেগেছিলো ১৩ হাজার। ট্রলার আগে থেকে ঠিক করে রাখা ছিলো আমাদের। আমাদের ট্রলার মামার নাম 'হরি মামা' অসম্ভব ভালো মনের একজন মানুষ এবং উনার রান্নাও যথেষ্ট ভালো ছিলো। হরি মামার নিজের ছোট বড় ২টা ট্রলার আছে। বড় ট্রলার কিংবা যদি সংখ্যায় আপনারা আরও কম হোন অথবা আরও একটু ছোট ট্রলার চাইলে ট্যুর দেবার ৭/১০ দিন আগে উনাকে ফোন করে জানিয়ে নিবেন ভাড়া ঠিকঠাক করে। ফোনঃ 01611716913
সতর্কতা এবং জানা প্রয়োজনঃ
১। পাওয়ার ব্যাংক নিয়ে যাবেন।
২। পানিতে নেমে গোসল করার সময় লাইফ জ্যাকেট নিয়ে নামার বিশেষ অনুরোধ।
৩। স্যালাইন, নাপা, গ্যাস্ট্রিকের ট্যাবলেট প্রয়োজন মনে করলে নিয়ে নিবেন।
৪। রোদ থেকে বাঁচতে হলে ছাতা নিয়ে যাবেন।
৫। এক্সট্রা বড় বা ছোট পলিথিন নিবেন সাথে করে।
৬। ট্রলার থেকে নামার সময় ট্রলারের জানালা সব লাগিয়ে নিবেন।
৭। নিলাদ্রি লেকে বেশিক্ষন গোসল করবেন না নতুবা সানবার্নের স্বীকার হতে পারেন।
৮। এছারা সানস্ক্রিন নিয়ে যেতে পারেন যদি ত্বক সচেতন হন।
৯। ট্রেনের যাবার টিকেট ১০দিন আগে এবং সাথে ফিরতি টিকেট কেটে রাখবেন।
১০। অতিরিক্ত শুচিবায়ুজনিত সমস্যা থাকলে নিজ দায়িত্তে যাবেন।
হাওড় আমাদের দেশের সম্পদ। তাই যেখানে সেখানে কিংবা হাওরের পানিতে পলিথিন, ময়লা আবর্জনা ফেলবেন না দয়া করে। হাওড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আমাদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্থ যেন না হয় সেদিকে খেয়াল রাখবেন।
